মঙ্গলবার

২৮ জুলাই, ২০২৬
১৩ শ্রাবণ, ১৪৩৩
২৮ ১৪৪৭

News Ticker
22.gif

আমিরাত ওপেক ছাড়ায় তেলের দাম কমতে পারে

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৯ এপ্রিল, ২০২৬ ১৭:২৭

শেয়ার

শেয়ার

আমিরাত ওপেক ছাড়ায় তেলের দাম কমতে পারে
আমিরাত ওপেক ছাড়ায় তেলের দাম কমতে পারে

সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) তেল রপ্তানিকারক দেশগুলোর জোট ওপেক থেকে বেরিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। তারা বলেছে এ বছার ১ মে থেকে তারা আর ওপেকের সাথে থাকবে না। আমিরাতের ঘোষণার পর থেকেই ওপেক নিয়ে আলোচনা বাড়ছে। রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম ‌‘ওয়াম’ (WAM)-এর বরাতে জানানো এই সিদ্ধান্তকে ঘিরে ওপেক নিয়ে বিশ্ব তেলবাজারে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই সিদ্ধান্তের স্বল্পমেয়াদে তেলের দামে বড় কোনো পরিবর্তন না এলেও দীর্ঘমেয়াদে বাজারে অস্থিরতা ও কাঠামোগত পরিবর্তনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

পেট্রোলিয়াম রপ্তানিকারক দেশের সংস্থা (ওপেক) প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৬০ সালে। এর লক্ষ্য ছিল সদস্য দেশগুলোর তেল নীতি সমন্বয় করা এবং বাজার স্থিতিশীল রাখা। যাতে ভোক্তারা নিয়মিত, সাশ্রয়ী ও নিরবচ্ছিন্নভাবে তেল পায়।

শুরুর দিকে সদস্য ছিল মাত্র পাঁচটি দেশ- ইরান, ইরাক, কুয়েত, সৌদি আরব ও ভেনেজুয়েলা। পরে সদস্য সংখ্যা বেড়ে ১২ টিতে দাঁড়ায়। বর্তমানে বিশ্বে উৎপাদিত অপরিশোধিত তেলের প্রায় ৩৬ দশমিক ১৭ শতাংশ সরবরাহ করে এই দেশগুলো। আর বৈশ্বিক তেল মজুতের প্রায় ৭৯ দশমিক ২২ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে ওপেক সদস্যরা। ইউএই ১৯৬৭ সালে এই জোটে যোগ দেয়।

ওপেকের পাশাপাশি আরেকটি নাম নিয়েও আলোচনা হচ্ছে। সেটি হলো ওপেক প্লাস। এটি আরও বড় একটি জোট। এতে ওপেক সদস্যদের পাশাপাশি রাশিয়াসহ অন্যান্য তেল উৎপাদনকারী দেশও আছে।

ওপেকের কাজ কী
সদস্য দেশগুলো নিয়মিত বাজার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে। এরপর তারা যৌথভাবে সিদ্ধান্ত নেয়- তেলের উৎপাদন বাড়ানো হবে, না কমানো হবে। এর মাধ্যমে তারা সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করে এবং দাম স্থিতিশীল রাখার চেষ্টা করে।

তেলের উৎপাদন কমালে বাজারে সরবরাহ কমে যায়, ফলে দাম বাড়ে। আবার উৎপাদন বাড়ালে সরবরাহ বেড়ে যায়, তখন দাম কমার প্রবণতা দেখা যায়। এই সিদ্ধান্তগুলো সাধারণত সর্বসম্মতভাবে নিতে হয়। ফলে ওপেকের সিদ্ধান্ত বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ ও দামের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে।

আমিরাতের জোট ছাড়ার প্রভাব

আমিরাতের ওপেক ছাড়ার খবরে তেলের দামে বড় কোনো পরিবর্তন আসেনি। বরং দামের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা ইরান যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই লক্ষ্য করা যাচ্ছে। অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, আমিরাতের এই সিদ্ধান্তের ফলে বিশ্ববাজারে সরবরাহ বাড়বে, ফলে দাম কিছুটা কমার সম্ভাবনা আছে।

এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অভিযোগ করেছিলেন, বাজারে সরবরাহ সীমিত রেখে ওপেক তেলের দাম কৃত্রিমভাবে বাড়াচ্ছে।

ইউএই চায় ওপেকের উৎপাদন কোটা বাড়ানো হোক। কারণ, বর্তমানে যতটা তেল উৎপাদনের অনুমতি আছে, তার চেয়ে তাদের উৎপাদনের সক্ষমতা অনেক বেশি। ইউএই জানিয়েছে, তারা জোট থেকে বেরিয়ে আগামী ১ মে থেকে নিজেদের মতো করে উৎপাদনের মাত্রা নির্ধারণ করবে।

ওপেক সদস্য দেশগুলোর তেল ও জ্বালানিমন্ত্রীরা সাধারণত বছরে দুইবার বৈঠক করেন। সেখানে জোটের মোট উৎপাদনমাত্রা ঠিক করা হয়। প্রয়োজন হলে অতিরিক্ত জরুরি বৈঠকও হয়।
আমিরাতের ওপেক ছাড়ার খবরে তেলের দামে বড় কোনো পরিবর্তন আসেনি। বরং দামের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা ইরান যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই লক্ষ্য করা যাচ্ছে। অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, আমিরাতের এই সিদ্ধান্তের ফলে বিশ্ববাজারে সরবরাহ বাড়বে, ফলে দাম কিছুটা কমার সম্ভাবনা আছে।

এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অভিযোগ করেছিলেন, বাজারে সরবরাহ সীমিত রেখে ওপেক তেলের দাম কৃত্রিমভাবে বাড়াচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ইউএইর সিদ্ধান্তের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো সরবরাহ ব্যবস্থার বাধা। কারণ ইরান-সংক্রান্ত সংঘাত এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহন বাধাগ্রস্ত হওয়ায় বাজারে প্রভাব সীমিত রয়েছে।

পেপারস্টোন এর সিনিয়র বিশ্লেষক মাইকেল ব্রাউন বলেন, আমিরাতের এমন সিদ্ধান্ত স্বল্পমেয়াদে হয়তো প্রভাব খুব সীমিত। তবে দীর্ঘমেয়াদে ব্যাপক।

এদিকে ইউএই জানিয়েছে, এটি একটি ‌‘সার্বভৌম সিদ্ধান্ত’ এবং দীর্ঘ পর্যালোচনার পর নেওয়া হয়েছে।

দেশটির জ্বালানি মন্ত্রী বলেন, বাজার পরিস্থিতি অনুযায়ী দ্রুত ও নমনীয়ভাবে উৎপাদন নির্ধারণের লক্ষ্যেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ইউএই বর্তমানে দৈনিক প্রায় ৩.৪ মিলিয়ন ব্যারেল তেল উৎপাদন করছে এবং ২০২৭ সালের মধ্যে তা বাড়িয়ে প্রায় ৫ মিলিয়ন ব্যারেলে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় সমস্যা উৎপাদন নয়, বরং তেল পরিবহন ও সরবরাহ ব্যবস্থা। বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়, যা বর্তমানে বড় ঝুঁকিতে রয়েছে।

দীর্ঘমেয়াদে বাজারে পরিবর্তনের সম্ভাবনা

বিশ্লেষকদের মতে, ইউএইর এই সিদ্ধান্ত দীর্ঘমেয়াদে বিশ্ব তেলবাজারে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। তারা যে ধরনের প্রভাব পড়তে পারে ধারণা করছেন, সেগুলো হলো- 

* ওপেকের সমন্বিত উৎপাদন নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হতে পারে
* সদস্য দেশগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা বাড়তে পারে
* বাজারে দাম নির্ধারণে অস্থিরতা তৈরি হতে পারে
* সরবরাহ নীতিতে বড় পরিবর্তন আসতে পারে

রিস্টাড এনার্জির বিশ্লেষক জর্জ লিওন বলেন, ইউএইর এই সিদ্ধান্ত ওপেকের ‍‘স্পেয়ার ক্যাপাসিটি’ কমিয়ে দেবে, ফলে বাজার স্থিতিশীল রাখা কঠিন হতে পারে।

বাণিজ্যের ধরনে বদল
সংযুক্ত আরব আমিরাত ওপেক থেকে বেরিয়ে যাওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যের তেলের দাম কৃত্রিমভাবে বেশি রাখার সক্ষমতায় বড় ধাক্কা লেগেছে। ওপেকের প্রভাব কমে যাওয়া দীর্ঘমেয়াদে ভোক্তাদের জন্য ভালো হতে পারে। ইউএই অঞ্চলটির দ্বিতীয় বৃহত্তম উৎপাদক। ফলে তারা বাজারে নতুন বড় প্রতিযোগী হিসেবে আসবে এবং ওপেকের নির্ধারিত সীমাবদ্ধতা ছাড়াই তেল উৎপাদন করতে পারবে।

এ ঘটনায় আরও বোঝা যাচ্ছে, ইরান যুদ্ধ বিশ্ব বাণিজ্যের ধরনে স্থায়ী পরিবর্তন আনছে এবং নতুন সরবরাহ শৃঙ্খল তৈরি করছে। তবে বাজারে যে পরিবর্তনগুলো আসছে, সেটির প্রভাব এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। এটি কেবল শুরু।

আমিরাতের সিদ্ধান্তের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের তেল উৎপাদকদের জন্য অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র জ্বালানিতে স্বয়ংসম্পূর্ণ হলেও পুরোপুরি নয়। তারা যতটা তেল ব্যবহার করে, তার চেয়ে বেশি উৎপাদন করে ঠিকই, কিন্তু চাহিদার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এখনো আমদানি করতে হয়। কারণ, যুক্তরাষ্ট্রে যে হালকা ও নিম্ন-সালফারযুক্ত অপরিশোধিত তেল উৎপাদিত হয়, তা ভারী জ্বালানি ও অন্যান্য পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য তৈরিতে কম উপযোগী। ফলে কিছু তেলের জন্য এখনো মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভর করে ওয়াশিংটন।

সূত্র: গালফ নিউজবিবিসি

Revolution24TV Footer