ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশ অর্জনের মাইলফলক হলো চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান। ২০২৪ সালের ৩৬ জুলাই তথা ৫ আগস্ট বাংলাদেশ ভয়াবহ গণতন্ত্রহীন ফ্যাসিবাদী শাসনের কবল থেকে মুক্তি লাভ করে। এই অর্জনের জন্য ১,৪০০-এরও বেশি মানুষ শহীদ হন এবং ১৫ হাজারেরও বেশি মানুষ আহত হন। সেই শিহরণজাগানিয়া উত্তাল দিনগুলোর স্মৃতি আজও আমাদের স্মৃতিপটে জাগরুক।
চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের শুরুটা ছিল সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থা পুনর্বহালের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন। আগে থেকে শুরু হওয়া এ আন্দোলন ৩ জুলাই ২০২৪ নতুন মাত্রা পায়। বিক্ষোভ বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের গণ্ডি পেরিয়ে দেশের প্রধান মহাসড়ক ও গুরুত্বপূর্ণ নগরে ছড়িয়ে পড়ে, ফলে সরকারের ওপর চাপ বাড়তে থাকে।
আন্দোলনের কেন্দ্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দুপুর দেড়টা থেকে শিক্ষার্থীরা কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে জড়ো হতে শুরু করেন। দুপুর আড়াইটায় ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’-এর ব্যানারে মিছিল বের করে। মিছিলে তারা ‘জেগেছে রে জেগেছে, ছাত্রসমাজ জেগেছে’ এবং ‘কোটা না মেধা, মেধা মেধা’সহ বিভিন্ন স্লোগান দেন। মিছিলটি শিখা চিরন্তন, টিএসসি ও দোয়েল চত্বর হয়ে বিকেল ৩টা ৪৫ মিনিটে শাহবাগ মোড়ে পৌঁছায়। সেখানে টানা দ্বিতীয় দিনের মতো গুরুত্বপূর্ণ এই মোড় অবরোধ করা হয়। বিক্ষোভকারীরা পৌঁছানোর আগেই শাহবাগ ও আশপাশের এলাকায় বিপুল সংখ্যক পুলিশ মোতায়েন ছিল, তবে কোনো সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেনি।
আন্দোলনের সংগঠকরা তখন বলেন, ‘হাইকোর্ট ২০১৮ সালের কোটা ব্যবস্থা বাতিলের প্রজ্ঞাপনকে অবৈধ ঘোষণা করেছেন। সরকার এ বিষয়ে রিট আবেদন করেছে, যার রায় ৪ জুন হওয়ার কথা। যদি কোটা ব্যবস্থা পুনর্বহাল করা হয়, তাহলে আমরা আন্দোলন আরও জোরদার করব।’
রাজধানীর অন্যদিকে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাস থেকে তাঁতীবাজার মোড় পর্যন্ত মিছিল করে যান। সেখানে তারা যাত্রাবাড়ীগামী সড়ক প্রায় এক ঘণ্টা অবরোধ করে রাখেন, ফলে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে কয়েক শ শিক্ষার্থী কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার থেকে মিছিল নিয়ে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে যান এবং বিকেল সোয়া ৩টার দিকে সড়ক অবরোধ করেন। পরে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও পুলিশের অনুরোধে তারা অবরোধ প্রত্যাহার করেন।
আন্দোলন শুধু ঢাকায় সীমাবদ্ধ ছিল না। চট্টগ্রামে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সকাল ১১টায় শহীদ মিনারে সমবেত হয়ে মিছিলসহ প্রধান ফটকে যান এবং প্রায় ৪০ মিনিট চট্টগ্রাম-খাগড়াছড়ি মহাসড়ক অবরোধ করে রাখেন।
দেশের বিভিন্ন স্থানেও একই ধরনের কর্মসূচি পালিত হয়।
ময়মনসিংহে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ঢাকা-ময়মনসিংহ রেলপথে এক ঘণ্টারও বেশি সময় ট্রেন চলাচল বন্ধ রাখেন।
রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ঢাকা-রংপুর মহাসড়ক অবরোধ করে বৈষম্যমূলক নিয়োগব্যবস্থার বিরুদ্ধে দেশব্যাপী আন্দোলনের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করেন।
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বরিশাল-কুয়াকাটা মহাসড়ক অবরোধ করে যাত্রীবাহী ও পণ্যবাহী যান চলাচল বন্ধ করে দেন।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে টানা তৃতীয় দিনের মতো বিক্ষোভ অব্যাহত থাকে।
ক্যাম্পাসে ক্যাম্পাসে আন্দোলনকারীরা ‘কোটা ব্যবস্থা নিপাত যাক, মেধাবীরা মুক্তি পাক’ এবং ‘মেধাবীদের কান্না, আর না, আর না’সহ নানা স্লোগান দেন। এসব স্লোগানে মেধাভিত্তিক নিয়োগব্যবস্থার দাবি এবং কোটা পুনর্বহালকে অন্যায্য মনে করার ক্ষোভ প্রকাশ পায়।
অন্যদিকে, সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় ‘মুক্তিযোদ্ধা কোটা পুনর্বহাল আন্দোলন’ এবং ‘মুক্তিযোদ্ধা সন্তান’ ও ‘মুক্তিযোদ্ধা প্রজন্ম’ নামে প্ল্যাটফর্মগুলো রাজধানীর শাহবাগে ও রাজশাহীতে কোটা ব্যবস্থার সমর্থনে সমাবেশ-মানববন্ধন করে। পরে তারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যের দিকে মিছিল নিয়ে যায়। তারা হাইকোর্টের রায় বাস্তবায়ন এবং সেই অনুযায়ী নতুন প্রজ্ঞাপন জারির দাবি জানায়। তাদের সাত দফা দাবির মধ্যে মুক্তিযোদ্ধাদের উত্তরসূরিদের জন্য কোটা বহাল রাখার বিষয়টিও ছিল। তাদের প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিল, ‘কোটা ব্যবস্থা বৈষম্য সৃষ্টি করে না, বরং সমতা নিশ্চিত করে।’
দিন শেষে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে আন্দোলনটি আর শুধু বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে সীমাবদ্ধ নেই; এটি ধীরে ধীরে দেশব্যাপী গণআন্দোলনের রূপ নিতে শুরু করে।
পরদিন ৪ আগস্ট ২০২৪ একটি গুরুত্বপূর্ণ আদালতের রায় ঘোষণার কথা থাকায় আন্দোলন নতুন পর্যায়ে প্রবেশের জন্য প্রস্তুত হয়ে ওঠে।
আরও পড়ুন:







