মঙ্গলবার

২৮ জুলাই, ২০২৬
১৩ শ্রাবণ, ১৪৩৩
২৮ ১৪৪৭

News Ticker
22.gif

আল্লাহর ওপর ভরসা করা কেন ইমানের অপরিহার্য অংশ

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: ৫ মে, ২০২৬ ১৫:৩১

শেয়ার

শেয়ার

আল্লাহর ওপর ভরসা করা কেন ইমানের অপরিহার্য অংশ
আল্লাহর ওপর ভরসা করা কেন ইমানের অপরিহার্য অংশ

রাসুল (সা.) বলেছেন, জান্নাতে এমন একদল মানুষ প্রবেশ করবে, যাদের অন্তর হবে পাখির অন্তরের মতো। (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ৭৩৪১)

এই সংক্ষিপ্ত কিন্তু অর্থবহ বক্তব্যটি শুধু আখেরাতের সুসংবাদই বহন করে না; বরং মানবজীবনের আত্মোন্নয়ন, আধ্যাত্মিক পরিশুদ্ধি এবং সফলতার একটি মৌলিক নীতিও তুলে ধরে।

প্রশ্ন জাগে—কেন আত্মোন্নয়ন ও সফলতার আলোচনায় এই হাদিসটি প্রাসঙ্গিক? এর উত্তর নিহিত আছে “তাওয়াক্কুল” বা আল্লাহর ওপর নির্ভরতার ধারণার মধ্যে, যা ইসলামি জীবনদর্শনের এক গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।

মানুষ স্বভাবতই দুর্বল, সীমাবদ্ধ এবং অনিশ্চয়তার মধ্যে বসবাসকারী এক সত্তা। তার জ্ঞান সীমিত, তার শক্তি ক্ষণস্থায়ী। কিন্তু যখন সে তার আল্লাহর উপর নির্ভর করে, তখন সে এক অন্যরকম শক্তির অধিকারী হয়ে ওঠে।

এই নির্ভরতা শুধু মুখের কথা নয়; এটি একটি গভীর বিশ্বাস, যা মানুষের চিন্তা, কর্ম ও সিদ্ধান্তে প্রতিফলিত হয়। ইসলামে এই নির্ভরতাকেই বলা হয় তাওয়াক্কুল—যেখানে বান্দা তার সর্বোচ্চ চেষ্টা করার পর ফলাফলের দায়িত্ব আল্লাহর উপর ছেড়ে দেয় এবং যা আসে তাতেই সন্তুষ্ট থাকে।

এক হাদিসে পাখির অন্তরের সঙ্গে মানুষের অন্তরের তুলনা করা হয়েছে। বলা হয়েছে, পাখি প্রতিদিন সকালে খালি পেটে বাসা থেকে বের হয়, কিন্তু তার মনে কোনো উদ্বেগ থাকে না। সে জানে, তার রিজিক নির্ধারিত এবং সে তা পেয়ে যাবে। সন্ধ্যায় সে ভরা পেটে ফিরে আসে।  (সুনানে তিরমিজি, হাদিস : ২৩৪৪)

মুমিন তো তারাই, যাদের সামনে আল্লাহকে স্মরণ করা হলে তাদের হৃদয় কেঁপে ওঠে, তাঁর আয়াত পাঠ করা হলে তাদের ইমান বৃদ্ধি পায় এবং তারা তাদের প্রতিপালকের উপর ভরসা করে।
কোরআন, সুরা আনফাল, আয়াত: ২

এই উদাহরণটি মানুষের জন্য এক অসাধারণ শিক্ষা—চেষ্টা করতে হবে, কিন্তু ফলাফলের জন্য উদ্বিগ্ন হয়ে নয়; বরং আল্লাহর উপর ভরসা রেখে। এই বিশ্বাসই মানুষকে মানসিক প্রশান্তি দেয় এবং তাকে অস্থিরতা থেকে মুক্ত রাখে।

কোরআনে আল্লাহ তাওয়াক্কুলকারীদের প্রশংসা করেছেন। তিনি বলেন, “মুমিন তো তারাই, যাদের সামনে আল্লাহকে স্মরণ করা হলে তাদের হৃদয় কেঁপে ওঠে, তাঁর আয়াত পাঠ করা হলে তাদের ইমান বৃদ্ধি পায় এবং তারা তাদের প্রতিপালকের উপর ভরসা করে।” (সুরা আনফাল, আয়াত: ২)

আবার অন্য আয়াতে বলা হয়েছে, “যে আল্লাহর ওপর ভরসা করে, আল্লাহই তার জন্য যথেষ্ট।” (সুরা তালাক, আয়াত: ৩)

এই আয়াতগুলো স্পষ্ট করে যে, তাওয়াক্কুল শুধু একটি গুণ নয়; এটি প্রকৃত ইমানের একটি অপরিহার্য অংশ।

আত্মোন্নয়নের দৃষ্টিকোণ থেকে তাওয়াক্কুল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আধুনিক বিশ্বে সফলতার ধারণা অনেকাংশে আত্মনির্ভরতা, পরিকল্পনা ও কঠোর পরিশ্রমের উপর নির্ভরশীল।

কিন্তু ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গিতে এই সবকিছুর পাশাপাশি আল্লাহর ওপর নির্ভরতা অপরিহার্য। কারণ, মানুষ যতই পরিকল্পনা করুক, চূড়ান্ত ফলাফল নির্ধারণ করেন আল্লাহই। এই উপলব্ধি মানুষকে অহংকার থেকে দূরে রাখে এবং তাকে বিনয়ী করে তোলে।

অনেক আলেম এই হাদিসের ব্যাখ্যায় পাখির অন্তরের সঙ্গে মানুষের অন্তরের কয়েকটি সাদৃশ্য তুলে ধরেছেন।

প্রথমত, পাখির অন্তর কোমল। তাওয়াক্কুলকারী ব্যক্তির হৃদয়ও কোমল হয়। সে মানুষের প্রতি সদয়, দয়ালু এবং সহানুভূতিশীল হয়।

দ্বিতীয়ত, পাখি সবসময় সতর্ক ও ভীত থাকে। তেমনি একজন মুমিনও আল্লাহর প্রতি ভয় ও শ্রদ্ধা নিয়ে জীবনযাপন করে। সে ভালো কাজ করার পরও ভয় পায়, যদি তাতে কোনো ত্রুটি থেকে যায়; আবার খারাপ কাজ করলে সে ভয় পায় আল্লাহর শাস্তির।

এই ভয় তাকে সবসময় সচেতন রাখে এবং ভুল থেকে ফিরে আসতে সাহায্য করে।

তৃতীয়ত, পাখির জীবনে কোনো সঞ্চয় নেই; সে প্রতিদিনের রিযিকের উপর নির্ভর করে। এই দৃষ্টান্ত মানুষকে শেখায় যে, অতিরিক্ত দুনিয়াবি লোভ ও উদ্বেগ পরিহার করে আল্লাহর ওপর নির্ভর করা উচিত। এর অর্থ এই নয় যে, মানুষ চেষ্টা করবে না বা পরিকল্পনা করবে না; বরং সে চেষ্টা করবে, কিন্তু তার হৃদয় থাকবে আল্লাহর উপর নির্ভরশীল।

একজন মুমিনও আল্লাহর প্রতি ভয় ও শ্রদ্ধা নিয়ে জীবনযাপন করে। সে ভালো কাজ করার পরও ভয় পায়, যদি তাতে কোনো ত্রুটি থেকে যায়; আবার খারাপ কাজ করলে সে ভয় পায় আল্লাহর শাস্তির।

ইমাম তিবি (রহ.) বলেছেন, এই হাদিসে সাদৃশ্যের কারণ স্পষ্টভাবে উল্লেখ না করায় এর অর্থ ব্যাপক হয়েছে। অর্থাৎ, এখানে কোমলতা, আল্লাহভীতি, নির্ভরতা—সবকিছুই অন্তর্ভুক্ত। ফলে এই হাদিসটি বহুমাত্রিক শিক্ষা প্রদান করে, যা মানুষের আধ্যাত্মিক ও নৈতিক উন্নয়নে সহায়ক।

তাওয়াক্কুল মানুষের জীবনে এক ধরনের ভারসাম্য সৃষ্টি করে। একদিকে এটি তাকে কর্মঠ করে তোলে, কারণ সে জানে তাকে চেষ্টা করতে হবে; অন্যদিকে এটি তাকে শান্ত রাখে, কারণ সে জানে ফলাফল আল্লাহর হাতে।

এই ভারসাম্যই প্রকৃত সফলতার চাবিকাঠি। যারা শুধু নিজের ওপর নির্ভর করে, তারা ব্যর্থ হলে হতাশ হয়ে পড়ে; আর যারা আল্লাহর উপর নির্ভর করে, তারা ব্যর্থতাকেও শিক্ষা হিসেবে গ্রহণ করে এবং সামনে এগিয়ে যায়।

আজকের প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে মানুষ নানা ধরনের চাপ, উদ্বেগ ও হতাশার মধ্যে বসবাস করে। এই পরিস্থিতিতে তাওয়াক্কুল একটি মানসিক ও আধ্যাত্মিক আশ্রয় হিসেবে কাজ করে।

এটি মানুষকে স্থিরতা, ধৈর্য ও আশাবাদী মনোভাব প্রদান করে। একজন তাওয়াক্কুলকারী ব্যক্তি জানে, তার জীবনে যা ঘটছে, তা আল্লাহর পরিকল্পনার অংশ এবং এর মধ্যে কোনো না কোনো কল্যাণ নিহিত আছে।

আত্মোন্নয়ন ও সফলতার পথে তাওয়াক্কুল একটি অপরিহার্য উপাদান। এটি শুধু একটি আধ্যাত্মিক ধারণা নয়; বরং একটি বাস্তব জীবনব্যবস্থা, যা মানুষের চিন্তা, আচরণ ও মানসিক অবস্থাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।

 

Revolution24TV Footer